সুস্থ ও সবল থাকতে একজন মানুষের আর্দশ ওজন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে আদর্শ ওজন আছে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অসচেতন জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস, শরীরচর্চায় অমনোযোগী হওয়া অনেকাংশেই এর জন্য দায়ী। আমাদের চারপাশে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়, কেউ অধিক স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায়; আবার কেউ চিকন বা শুকনো স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত। সত্যি বলতে অধিক স্বাস্থ্য যেমন ভালো নয়, ঠিক তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় কম স্বাস্থ্যও ভালো নয়। তবে, আজকের এই আর্টিকেলে ওজন বাড়ানো নিয়েই আলোচনা করব। প্রিয় পাঠক, চলুন জেনে নিই— ওজন বাড়ানোর সহজ উপায় সমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত।
ওজন বাড়ানোর সহজ উপায়
ওজন বাড়ানো নিয়ে আমরা বিভিন্ন বিজ্ঞাপন হার হামেশাই দেখতে পাই। যেখানে আপনাকে বিভিন্ন ওষুধ, মিল্কশেক, চকলেটশেক, সিরাপ, ইত্যাদি খাওয়ার প্রলোভন দেখাবে। মাত্র ১ মাসে ৫-১০ কেজি ওজন বাড়বে, এমন প্রতিশ্রুতি দেবে। তবে, আপনাকে এসব বিজ্ঞাপন এড়িয়ে যেতে হবে। কারণ এসব ওষুধ বা শেক বা সিরাপ স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর। আর অধিকাংশ পণ্যেই ব্যবহৃত হয় ক্ষতিকর স্টেরয়েড। ওজন বাড়াতে এসব লোভনীয় জিনিসের একদমই দরকার নেই, বরং আপনার আশেপাশে থাকা প্রতিদিনকার চেনা খাদ্যই বাড়াবে ওজন।
যাই হোক, ওজন বাড়ানোর জন্য সর্বপ্রথম আপনাকে যাচাই করে নিতে হবে আপনার বিএমআই ঠিক আছে কিনা! বিএমআই বা বডি মাস ইনডেক্স হলো একজন মানুষের উচ্চতা ও ভর থেকে প্রাপ্ত মান। এই মান দ্বারা বোঝা যায়, একজন মানুষের উচ্চতা অনুসারে তার আর্দশ ওজন কত হওয়া উচিত। তাই সবার প্রথম আপনাকে জানতে হবে, আপনার উচ্চতা অনুসারে আপনার ওজন কতটুকু কম বা কত রয়েছে। যদি ওজন কম হয় তবে আমাদের পরামর্শ অনুসরণ করুন। আর হ্যাঁ, ওজন কখনোই একদিনে বা একলাফে বাড়বে না। আপনাকে নিয়ম মাফিক একটা রুটিন ফলো করতে হবে। এছাড়াও মনে রাখবেন ওজন বাড়ানো মানে মাংসপেশী বৃদ্ধি করা। এমন নয় যে চর্বি বৃদ্ধি করবেন। চর্বি আমাদের শরীরের জন্য যে কী পরিমাণে ক্ষতিকর সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কম বেশি আমরা সবাই জানি। যাই হোক, কথা না বাড়িয়ে চলুন ওজন বাড়ানোর সহজ উপায় গুলো সম্পর্কে জেনে নিই।
খাদ্য তালিকা:
ওজন বাড়াতে গেলে প্রথমেই আপনাকে খাবার তালিকায় নজর দিতে হবে। আপনার শরীরে প্রতিদিন যতটুকু ক্যালরি ক্ষয় হয়, আপনার তার চেয়ে বেশি প্রায় ৫০০-৭০০ ক্যালরি অতিরিক্ত গ্রহণ করতে হবে। আর বেশি ক্যালরির জন্য আপনাকে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার। নিম্নে একটা তালিকা দেওয়া হলো-
১। সকালের নাস্তা:
সকালের নাস্তায় ডিম, দুধ ও কলা রাখুন। ডিম ও দুধে রয়েছে আমিষ এবং বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। এছাড়াও ডিম, দুধ অন্য খাবারের সাথে অনায়াসে খাওয়া যায়। তবে কেবল যে দুধ, ডিম, কলা খাবেন সকালের নাস্তায় এমন নয়। সাথে রুটি, নুডুলস বা অন্যকিছু খেতে পারেন। তবে, অবশ্যই খেয়াল রাখুন খাবারে যেন চর্বি বা তেল কম থাকে। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, এত ফল থাকতে কলা কেন! কলা একে তো সহজলভ্য, তেমনি এটি মাল্টি পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। আর প্রায় সারা বছরই কলা পাওয়া যায়। তবে, আপনি চাইলে মৌসুমী বা অন্য ফলও খেতে পারেন। কিন্তু, কলাকে অবশ্যই নাস্তায় রাখুন।
⏩ আরও পড়ুন: ফুলকপির উপকারিতা ও অপকারিতা!
২। দুপুরের খাবার:
আমাদের জন্য দুপুরের খাবারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুপুরের খাবারে আহামরি তেমন আয়োজন করতে হবে না। ভাতের সাথে আপনার হাতের কাছে পাওয়া একবাটি মসুর ডালই যথেষ্ট। এছাড়াও রাখতে পারেন মুরগির মাংস। অনেকে অবশ্য গোরুর মাংস বা খাসির মাংস খাওয়ার পরামর্শ দেয়। তবে, গোরু বা খাসির মাংস নিয়মিত খাওয়া আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তবে, আমরা ক্ষতি ছাড়াই ডাল ও মুরগির মাংস খেয়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারি। এছাড়াও সবজি, মাছ (বিশেষ করে সমুদ্রের মাছ), শাক, খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন। তবে, যাই রাখুন সাথে ডাল বা মুরগির মাংস অবশ্যই রাখুন। সহজ কথায়, আপনি প্রতিদিন যা খান তাই খাবেন, কেবল সাথে একদিন ডাল রাখলে অন্যদিন মুরগির মাংস রাখুন। আর মাঝে মধ্যে গোরুর মাংস বা খাসির মাংস খেতে পারেন। তবে, নিয়মিত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না।
৩। বিকালের নাস্তা:
বিভিন্ন ধরনের বাদাম রাখুন। কারণ বাদামে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ক্যালরি। বাদামের মধ্যে রাখতে পারেন- কাজুবাদাম, পেস্তা বাদাম, চিনা বাদাম, আখরোট, কাঠবাদাম। এছাড়াও টকদই, খেজুর রাখুন। এক্ষেত্রে টকদইয়ের সাথে কিশমিশ মিক্স করে খান। কিন্তু, নিয়মিত কখনোই মিষ্টি দই খাওয়া যাবে না। কারণ মিষ্টি দইয়ে প্রচুর চিনি ব্যবহার করা হয়। চিনিযুক্ত খাবার প্রতিদিন খেয়ে ডায়াবেটিসের সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও চিনি আমাদের শরীরের অন্যান্য ক্ষতিও করে। তাই চিনিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়াও এড়িয়ে চলতে হবে ফাস্টফুড জাতীয় খাদ্য।
৪। রাতের খাবার:
রাতের খাবার দুপুরের ন্যায়। ডাল বা মুরগির মাংস রাখলেই হবে। আর বিশেষ কোনো পরিবর্তন নেই।
এবার আসি ডেজার্টের বিষয়ে, অনেকেরই খাবার খাওয়ার পর ডেজার্ট খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। আগেই বলেছি চিনিযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়া যাবে না। তাই মিষ্টি ফল যোগ করে ডেজার্ট বানিয়ে খেতে পারেন অথবা ২-৩ টি খেজুর খেতে পারেন। আর অনেকের খাবারের মধ্যবর্তী সময়গুলোতেও ক্ষুধা লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে ৫-১০ টি বাদাম খান, কিশমিশ খান।
তাছাড়াও প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন ধরনের বীজ জাতীয় খাবার রাখুন। যেমন- শিমের বীজ, ছোলা, তিল, কুমড়োর বীজ, তিসি, কালোজিরা, ফেলন বীজ, বিভিন্ন ধরনের বিনস, ইত্যাদি। তিল, তিসি ও কালোজিরা বিভিন্ন খাবারের ওপরের ছিটিয়ে খেয়ে নেওয়া যায় সহজে, আবার এর পুষ্টিগুণও অধিক।
তবে, এইখানে উল্লেখিত চার্ট অনুসারেই যে প্রতিবেলার খাবার প্রতিবেলাই খেতে হবে এমন নয়। আপনি চাইলে একটু পরিবর্তন করে খেতে পারেন। যেমন সকালে দুধ, ডিম বা কলা একত্রে খেতে ইচ্ছা না করলে দুপুরে বা সন্ধ্যায় খেতে পারেন। খাবার সময়ের দিকে অবশ্যই নজর রাখুন। সকালের নাস্তা সকাল ৮ টার মধ্যে খান। দুপুরের খাবার ১২-১ টার মধ্যে, বিকালের নাস্তা ৫-৬ টার মধ্যে, রাতের খাবার ১০টার মধ্যে এবং রাত ১২ টার আগে ঘুমিয়ে যান এবং যতটা সম্ভব দুশ্চিন্তামুক্ত থাকুন। আর সকালে ঘুম থেকে উঠেই এক গ্লাস পানি পান করুন। এরপর রিফ্রেশিং এর জন্য এক চামচ মধু দিয়ে তুলসি বা ভেষজ চা খান। তবে, দুধ চা, কফি, গ্রিন টি এড়িয়ে চলুন। সালাদে শসা খাওয়া বাদ দিন। কেবল গাজর খেতে পারেন।
⏩ আরও পড়ুন: গাজরের উপকারিতা ও অপকারিতা!
ব্যায়াম:
কেবল মাত্র খাওয়ার তালিকায় নজর দিলেই হবে না, ওজন বাড়াতে হতে নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। অনেকেই ভাবেন, চিকন হতে চাইলেই কেবল ব্যায়াম বা শরীরচর্চার প্রয়োজন। যা একদমই ভুল। আপনার মাংসপেশী বৃদ্ধি করতে নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। তবে, এর জন্য জিমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ঘরে বসেই ব্যায়াম করতে পারেন। আজকাল ইউটিউবে সব শেখা যায়। ইউটিউবে নিচের এই ব্যায়ামগুলো লিখে সার্চ দিন এবং নিয়মিত এগুলো চর্চা করুন-
Lunge Excercise
Squat Excercise
Plank Excercise
Push-Up Excercise
তবে, এসব ব্যায়াম করার ক্ষেত্রে সর্তকতা অবলম্বন করুন। আগে নিজের শরীরকে ফেক্সিবল করে এমন কিছু ব্যায়াম করে প্রস্তুত করে নিন। খাওয়া এবং ব্যায়াম দুটোর ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তুলুন।
এগুলো কয়েক মাস মেনে চলার পরও যদি আপনার স্বাস্থ্যের উন্নতি না ঘটে তবে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরাণাপন্ন হোন। অনেকের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগের জন্যও অনেক সময় ওজন কমতে পারে। তাই দ্রুত রোগ ডায়াগনোসিস করা জরুরি। তাছাড়াও এই তালিকার কোনো খাবার পেটে সহ্য না হলে ওই খাবার বাদ দিন। সবচেয়ে ভালো হয়, যেকোনো ডায়েট অনুসরণ করার পূর্বে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিন। কেন না ওজন বাড়ানোর সহজ উপায় যতই বলি; আপনার শরীরে কার্যকর হবে তার তো গ্যারান্টি নেই। কারণ প্রত্যেক মানুষের আলাদা খাদ্যভ্যাস রয়েছে। তাই হুট করে ডায়েট শুরু করলে যেকোনো সমস্যা হতেই পারে। আবার অনেকে বংশগত বা জেনেটিক কারণে একটু চিকন হয়ে থাকে। তাই কোনো কিছু মেনে চলার আগে জানতে হবে আপনার সমস্যা ঠিক কোথায়!
প্রিয় পাঠক, এই ছিল— ওজন বাড়ানো সহজ উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত! আজকের পোস্ট এই পর্যন্ত। পোস্টটি ভালো লাগলে পরিচিত বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আপনার কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকলে কমেন্ট করুন। এই ধরনের পোস্ট আরও পড়তে ডেইলি লাইভ সাইটে চোখ রাখুন।
ওজন কমানোর উপায় জানতে চাই।🥲