শীতকালীন সবজির মধ্যে অধিক জনপ্রিয় ও সুস্বাদু সবজি হলো ফুলকপি। শীতকালে বাঙালির রসুইঘরে ফুলকপি নানা পদে রূপান্তির হয়। ফুলকপির পাকোড়া, ফুলকপি কারি বা ভাজি, অথবা ফুলকপির তরকারি। এটি দেখতে যেমন ধবধবে সাদা, ঠিক তেমনি এটি খেতেও বেশ সুস্বাদু। এই ফুলকপিকে চেনেন না বা এর স্বাদ নেননি এমন মানুষ পাওয়া মুশকিল। কিন্তু, জানেন কি এই ফুলকপির রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা এবং রয়েছে কিছু অপকারিতা। তো চলুন, আজকে ডেইলি লাইভের এই আর্টিকেলে জেনে নিই— ফুলকপি কী, ফুলকপির ব্যবহার, ফুলকপির পুষ্টি উপাদান এবং ফুলকপির উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত।
ফুলকপির নানাবিধ উপকারিতা ও অপকারিতা
ফুলকপি:
ফুলকপি বা Cauliflower হলো এক ধরনের শীতকালীন বা বার্ষিক সবজি। জনপ্রিয় এই ফুলকপি সাধারণত ব্রাসিকেসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ব্রাসিকা অলেরাসিয়া বা Brassica Oleracea প্রজাতির একটি সবজি। এটি সবুজ পাতায় ঘেরা সাদা রঙয়ের একটি সবজি। ফুলকপির এই সাদা অংশটুকু ফুলের ন্যায় দেখতে বলেই একে বাঙালিরা ফুলকপি নামে ডাকে। ফুলকপির বৈজ্ঞানিক নাম Brassica Oleracea var. botrytis। এটি দ্বিবর্ষজীবী গাছ হিসাবে গণ্য হলেও এর অনেক বর্ষজীবী জাত ও রয়েছে।
জানা যায়, ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় এই ফুলকপির আদিস্থান। পরে তা ইউরোপে ছড়িয়ে পরে এবং এখন এটি সারা বিশ্বেই অতি পরিচিত। তবে, এই ফুলকপির প্রধান প্রধান জাত উদ্ভাবিট হয়েছে গ্রিস, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্সসহ নানা দেশে। আর বাংলাদেশে এই ফুলকপির চাষ হয় শীতকালে, কারণ এটি শীতল ও আর্দ্র জলাবায়ুতে ফলে।
ফুলকপি বর্তমানে বিভিন্ন রঙের ও ঢংয়ের পাওয়া যায়। যার মধ্যে কিছু ন্যাচারাল মিউটেশনের ফলে হয়েছে এবং কিছু কৃত্রিমভাবে বা যাকে বলে হাইব্রিড এমন উপায়ে তৈরি করা হয়েছে। ফুলকপির বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য জাত হলো- কার্তিকা, অগ্রহায়ণী, পোষাণী, মেইন ক্রপ, ট্রপিক্যাল গ্রো-৫৫, হোয়াইট ব্যারন, আর্লিপাটনা, স্নোবল ওয়াই, সুপ্রিমাক্স, মাঘী বেনারসী, মাউন্টেন, এলাগন, রাক্ষসী, পুশা দীপনী, ইত্যাদি। তবে, বাজারে বেগুনি, হলুদ, সবুজ, কমলা বিভিন্ন রঙয়ের ফুলকপি রঙ ভিত্তিকই পরিচিত। এছাড়া ব্রকলিও এক ধরনের ফুলকপি।
ফুলকপির ব্যবহার:
সাধারণত ফুলকপির সাদা অংশটুকু খাওয়া হয়। তবে, সবুজ ডাটা ও পাতা দিয়ে স্যুপ, ভাজি করা হয়। আবার, এই সবুজ পাতা ও ডাটা গৃহপালিত পশুর প্রিয় খাদ্য। ফুলকপি কাঁচা বা রান্না দুইভাবেই খাওয়া যায়। এটির সালাদ ও আচার বেশ জনপ্রিয়।
ফুলকপির পুষ্টি উপাদান:
ফুলকপিতে বিদ্যমান রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান। এতে রয়েছে- ভিটামিন সি, ভিটামিন বি, ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, ইত্যাদি। গবেষণা মতে, একটি মাঝারি আকার ফুলকপিতে উপস্থিত রয়েছে- শক্তি-২৫ কিলোক্যালরি, কার্বোহাইড্রেট-৪.৯৭ গ্রাম , প্রোটিন-১.৯২ গ্রাম , ফ্যাট-০.২৮ , আঁশ-২ গ্রাম, ফোলেট-০.৫৭ মাইক্রোগ্রাম, নিয়াসিন-০.৫০ মাইক্রোগ্রাম, থায়ামিন-০.০৫ , প্যানথানিক এসিড-০.৬৬৭ মাইকোগ্রাম। তাই বলা যায়, ফুলকপি একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি।
⏩ আরও পড়ুন: কাঁঠালের উপকারিতা ও অপকারিতা!
ফুলকপির উপকারিতা:
ফুলকপি স্বাদে গুণে অনন্য এক সবজি। এই ফুলকপি পছন্দ করেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এটিতে রয়েছে নানাবিধ পুষ্টি উপাদান, যার দরুণ এই সবজি খেলে নানা উপকার পাওয়া যায়। যেমন:
১| শরীরে কোলস্টেরলের মাত্রা কমায় এই নজরকাড়া সাদা ফুলকপি। কারণ ফুলকপিতে বিদ্যমান রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। আর এই ফাইবার কোলস্টেওরলের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে।
২| আধুনিক এই যুগে অতিরিক্ত ওজন কেউ পছন্দ করেন না। আবার, শরীর সুস্থ রাখতে ওজন ঠিক রাখাও জরুরি। তবে, ওজন কমানো খুব একটা সহজ নয়। বিভিন্ন শারীরিক চর্চার পাশাপাশি খাবারের তালিকাতেও কড়া নজরদারি করতে হয়। তবে ওজন কমাতে টনিকের মতো কাজ করে এই ফুলকপি।
৩| ফুলকপি আমাদের মস্তিষ্ক ভালো রাখতে সহয়তা করে। ফুলকপিতে বিদ্যমান থাকা ভিটামিন-বি মস্তিষ্কের উন্নয়নে বিশেষ কাজ করে। এছাড়াও এতে থাকা কলিন আমাদের মস্তিষ্কের কগনিটিভ প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রধান করে। যার দরুণ ফুলকপি খেলে আমাদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায় ও কোনো বিষয় দ্রুত শিখতে সহায়তা করে। এইজন্য বাচ্চাদের নিয়মিত ফুলকপি খাওয়ানো উচিত।
৪| হাড় ও দাঁত শক্ত করতে ফুলকপির জুড়ি মেলা ভার। কারণ ফুলকপিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ফ্লোরাইড। আর আমরা জানি, হাড় ও দাঁত শক্ত করতে এই দুইটি উপাদান বেশ কার্যকরী।
৫| শুনতে অবাক হলেও, ফুলকপি মরণব্যাধি মারাত্মক ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে। ফুলকপিতে থাকা সালফোরাপেনই এর জন্য দায়ী৷ এই সালফোরাপেন ক্যান্সারের সেলগুলোকে মেরে টিউমার বেড়ে যেতে দেয় না। বলা হয়, স্তন ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার ও মূত্রথলির ক্যান্সারের জীবাণু প্রতিহত করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে ফুলকপির।
৬| আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো হৃৎপিণ্ড বা হৃদযন্ত্রে। এই হৃদযন্ত্র সুস্থ ও সবল রাখতে পারে ফুলকপি। কারণ ফুলকপিতে রয়েছে সালফোরাপেন।
৭| বিভিন্ন ধরনের রোগ প্রতিরোধ করে ফুলকপি৷ ফুলকপিতে উপস্থিত রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, যেমন-ভিটামিন বি, সি ও কে। এই ভিটামিনগুলো মৌসুমী পরিবর্তনের প্রভাবে হওয়া জ্বর, সর্দি, কাশি, নাক বন্ধ হওয়া দূর করে। এছাড়াও গা-ব্যথাও দূর করে।
৮| ফুলকপিতে যেহেতু প্রচুর পরিমাণে আয়রন উপস্থিত রয়েছে, তাই ফুলকপি খেলে শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি পাওয়া যায়। যেহেতু রক্ত তৈরি করতে আয়রনের ভূমিকা রয়েছে। এইজন্য ডাক্তাররা গর্ভবতী মহিলাদের ও দুর্বল মানুষদের ফুলকপি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
৯| আমাদের নিজেদের ত্বক ও চুল সবারই অধিক প্রিয়। তবে, বিভিন্ন কারণে চুল নষ্ট হয় এবং ত্বক সংক্রমিত হয়। এক্ষেত্রেও ফুলকপি বেশ কার্যকরী। কারণ ফুলকপিতে ক্যালরি কম থাকে এবং এটি অতি উচ্চমাত্রার আঁশসমৃদ্ধ৷
১০| আমাদের পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখতেও সহায়তা করে ফুলকপি। এটিতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও সালফার-জাতীয় উপাদান, যা খাবার হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। এছাড়াও ফুলকপিতে থাকা ফাইবারও খাবার হজম করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
১১| একজন মানুষের জন্য দৃষ্টিশক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতেও ফুলকপি বেশ উপকারী। আমরা জানি, ভিটামিন এ আমাদের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে। আর ফুলকপি প্রচুর পরিমাণে রয়েছে এই ভিটামিন এ। তাই যাদের চোখের দৃষ্টির সমস্যা তাদের নিয়মিত ফুলকপি খাওয়া উচিত।
১২| আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ দহন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এই দহনের পরিমাণ অধিক হারে আবার বৃদ্ধি পেলে তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এর ফলে ক্যান্সার বা এ ধরনের রোগের সম্ভাবনা অধিক বেড়ে যেতে পারে। তবে, ফুলকপিতে উপস্থিত রয়েছে ‘অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি নিউট্রিয়েন্টস’। ফলে, নিয়মিত ফুলকপি খেলে এটি শরীরের দহন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
১৩| ফুলকপি ভিটামিন এবং মিনারেলের অন্যতম উৎস। আমাদের শরীর সুস্থ ও সবল রাখলে এই মিনারেল ও ভিটামিনের খুবই প্রয়োজন। তাই, যদি নিয়মিত ফুলকপি খাওয়া হয় তবে তা দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে। উল্লেখ্য, ফুলকপিতে প্রচুর ভিটামিন-সি থাকে। এছাড়াও এতে আছে ভিটামিন কে, ভিটামিন বি৬, প্রোটিন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ফাইবার, পটাসিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ, ইত্যাদি।
ফুলকপির অপকারিতা:
ফুলকপির নানাবিধ উপকারিতা যেমন রয়েছে, তেমনি এর বেশ কিছু অপকারিতাও রয়েছে। যেমন:
১| অতিরিক্ত পরিমাণে কোনো কিছুই খাওয়া ঠিক নয়। অতিরিক্ত ফুলকপি খেলে তা আমাদের কিডনিতে পাথর সৃষ্টি করতে পারে। আর যাদের আগে হতেই কিডনিতে পাথরের সমস্যা রয়েছে, তাদের ফুলকপি একদমই খাওয়া উচিত নয়। কারণ এতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম যা পাথরের সমস্যা বৃদ্ধি করতে পারে।
২| অতিরিক্ত ফুলকপি খেলে গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি হয়। যাদের গ্যাস, ফুলে যাওয়া এবং অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে তারা অধিক ফুলকপি খেলে তা ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। কারণ ফুলকপিতে উপস্থিত রয়েছে কার্বোহাইড্রেট যা সহজে হজম হয় না অথবা হজম সমস্যা বৃদ্ধি করতে পারে। এইজন্য যাদের এমন সমস্যা রয়েছে তাদের ফুলকপি না খাওয়াই উত্তম৷
৩| যাদের আগে হতেই থাইরয়েড সমস্যা আছে। তাদের জন্য ফুলকপি বেশ ক্ষতিকর। কারণ ফুলকপি খেলে T3 এবং T4 হরমোনের পরিমাণ অধিক হারে বৃদ্ধি পায়, যা থাইরয়েড বাড়ায়। তাই থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত রোগীদের ফুলকপি খাওয়া একদমই উচিত না।
৪| অনেক সময় আমাদের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা এবং ফোলাভাব হয়। এই জয়েন্ট ব্যথা ও ফোলাভাবের জন্য দায়ী উচ্চ মাত্রার ইউরিক অ্যাসিড, যা ফুলকপি খেলে বেড়ে যেতে পারে। থাকতে পারে।
৫| ফুলকপি খেলে আমাদের রক্ত ঘন হতে পারে। তাই যাদের রক্ত সংক্রান্ত পূর্বেই কোনো সমস্যা রয়েছে, তাদের ফুলকপি খাওয়া বাদ দিতে হবে।
৬| যেসব বাচ্চারা মায়ের বুকের দুধ খায়। তাদের মায়েদের ফুলকপি হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ ফুলকপি খেলে তাদের বাচ্চার পেটে ব্যথা হতে পারে। যেহেতু এটি গ্যাসের সমস্যা তৈরি করে।
প্রিয় পাঠক, এতক্ষণ আমরা আলোচনা করলাম, ফুলকপি সম্পর্কে বিস্তারিত। আশাকরি আজকের আর্টিকেলটি আপনার ভালো লেগেছে। যদি এই আর্টিকেলটি ভালো লাগে তবে অবশ্যই অন্যদের সাথে শেয়ার করবেন এবং এই ধরনের আরও আর্টিকেল পেতে ‘ডেইলি লাইভ‘ এর সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ।
informative article ❤️
ভালো পোস্ট। ফুলকপি আমার প্রিয় সবজি
উপকারী পোস্ট।
ফুলকপি খুব পছন্দের সবজি। জেনে ভালো লাগলো।
ফুলকপি শীতকালীন সবজিগুলোর মধ্যে সত্যিই স্বাদের সবজি। এই সবজটি আমার খুবই পছন্দ। এতদিন কেবল পছন্দ ছিল, এখন এর উপকারিতা জেনে সত্যিই ভালো লাগছে।