শান্তি কমিটি | আবুল হাসনাত বাঁধন

শান্তি কমিটি | আবুল হাসনাত বাঁধন

শান্তি কমিটি | আবুল হাসনাত বাঁধন

এক.

খুব জোরে জোরে একটা কুকুর ঘেউঘেউ করছে। হঠাৎ একটা গুলির শব্দ হলো। এরপর সবকিছু নিস্তব্ধ। কুকুরটার ঘাড়ের একটু নিচেই গুলি লেগেছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। জিহ্বাটা বের করে মাটিতে নেতিয়ে পড়ল সে। গাঢ় নীল মণিযুক্ত চোখগুলো খোলা রেখেই মরল, হাবিবের কুকুর বাঘা। হাবিবকে মার খেতে দেখেই চিৎকার করছিল ওটা। আচমকাই তেড়ে আসছিল পাক বাহিনীর দিকে। কর্ণেল আলীর হ্যান্ড পিস্তলের গুলিতে মারা পড়েছে।

হাবিবকে চারদিক থেকে ঘিরে আছে পাক সেনারা। যতরকম ভাবে আঘাত করা যায়, করছে তাকে। খালি গা, পরনে কিছু নেই। একটা পুরোনো লুঙ্গি পরা। মাথায় একটা গামছা বাধা ছিল। বন্দুকের গুঁতোয় সেটা খুলে পড়েছে। তাঁর তামাটে গা থেকে ঘাম ঝরছে। কোনো কোনো জায়গায় ঘাম আর রক্ত একত্রে মিশে যাচ্ছে। তাঁকে উঠোনে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে চারদিক থেকে বন্দুক দিয়ে আঘাত করছে পাক সেনারা।

একটু পর কর্ণেল আলী আসে হাবিবের সামনে। বুট জুতো দিয়ে সজোরে লাথি দেয় হাবিবের তলপেটে। কপাল বরাবর পিস্তল ধরে বলে,
– বোলো, তুম মুক্তি হো?
– কমু নাহ।
এবার বন্দুকের পিছনের অংশ দিয়ে হাবিবের মুখে আঘাত করে। হাবিবের ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে।

শান্তি কমিটির সভাপতি মজিদ বলে ওঠে, ‘স্যার, ও-ই মুক্তিযোদ্ধা। ওরে জিগান ওদের ঘাঁটি কোনহানে! হালা রা দেশ ভাগ করার চক্রান্ত করতাছে।’

কর্ণেল হাবিবের চুল মুঠোয় ধরে আবার জিজ্ঞেস করে।
– বোলো, তোমারা বাকি সাথিও কাহা হে? তুম লোক, কাহা রেহেতাহো?
– আমারে মাইরা ফালাও, তবুও কমু নাহ!
– হারামি, কুত্তা কা আওলাদ! উসে মার দো।

হাবিব হাত বাঁধা অবস্থায় উঠোনে শুঁয়ে পড়ে। মাটিতে চুমু খেয়ে বলে- ‘মা, আমারে জড়ায়া নেও!’

এরপর তিন-চারটা গুলির আওয়াজ হয়। পাক বাহিনীর একটা জিপ রাস্তা দিয়ে চলে যায়। উঠোনে পড়ে থাকে চারটা লাশ।

⏩ আরও পড়ুন: পদ্মা নদীর মাঝি : পাঠ প্রতিক্রিয়া!

ঘণ্টা দুয়েক আগে দৃশ্যটা অন্য রকম ছিল। বৃদ্ধ বশর মিয়া দাওয়ায় বসে হুঁকো টানছিল। রানু রান্নাঘরে তরকারি কাটায় ব্যস্ত। হাবিবের বউ সে। ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। হাবিবের একমাত্র ছেলে দীপু উঠোনে একা একা খেলছিল। যুদ্ধের কারণে বাইরে খেলতে যেতে পারে না। বয়স ১০ বছর। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী এসে ঘাঁটি গাড়ল ওদের স্কুলেই। সেই থেকে আর কেউ স্কুলে যায় না।

যুদ্ধ বাঁধার কিছুদিন পরেই হাবিব, মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ওই সময় গ্রামের মানুষ দু-পক্ষে ভাগ হয়ে যায়। একপক্ষ যুদ্ধের পক্ষে, অপর পক্ষ বিরুদ্ধে। বিরোধী পক্ষ ‘শান্তি কমিটি’ নামে একটা কমিটি গঠন করে। সেখানে যোগ দিলো- মজিদ, কেরামত, আফজাল আলীসহ গ্রামের আরও কয়েকজন। ওদের কাজ শান্তি রক্ষায় পাক বাহিনীকে সাহায্য করা, মুক্তি বাহিনীকে দমন করা। হাবিব মুক্তি বাহিনীতে থাকায় গ্রামের শান্তি কমিটির কথা জানত না।

আজ, মাঝ দুপুরে, সূর্য তখন ঠিক মাথার ওপরে। আচমকা মজিদ পাক বাহিনীর একটা দল নিয়ে ঢুকল হাবিবের বাড়িতে। বশর মিয়া দাওয়া থেকে উঠে উঠোনে আসে।
– কিরে মজিদ? কিডা চাস?
– স্যার এইডা হাবিবের বাপ! হাবিব হালায় মুক্তিযোদ্ধা।
– তোমারা ব্যাটা কাহা হে?

বশর মিয়া চুপ করে থাকে। রানু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। দীপু এসে দাঁড়ায় দাদার পাশে। কর্ণেল আলী দীপুকে টেনে সামনে আনলো।
– তেরা বাপ কাহা হে?
– জানি না, বাজান যুদ্ধে গেছে।

এরপর দীপুকে চড় মেরে ফেলে দেয় কর্ণেল। রানু এসে কেঁদে কেঁদে তাকে তুলে। আর বলে- ‘স্যার! আমাগোরে ছাইড়া দেন।’

প্রায় সাথে সাথে বশর মিয়ার বুকে গুলি করে কর্ণেল। রানু দৌড়ে গিয়ে, ‘আব্বা! আব্বা!’ করে ডাকে। কর্ণেল দীপুকে জিজ্ঞেস করে,
– তুম লোক মুসলমান হো?
– হ
– কালেমা বোলো!
– লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ!
– আব বলো- পাকিস্তান জিন্দাবাদ!
– কমু নাহ।
– নেহি বলো গি তো, তুম মা-ব্যাটে কো মার দুঙ্গি! বলো- পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

এটা শুনে দীপু, ‘জয় বাংলা! জয় বাংলা!’ বলে পাশে থেকে একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে কর্ণেলের মাথায় মেরে দেয়। কর্ণেল মাথায় হাত দিয়ে আর্তনাদ করে উঠে। আঙুলের ফাঁকে রক্ত দেখা যাচ্ছে। একটু পরই কয়েক রাউন্ড গুলি দীপুর বুকটা ঝালাফালা করে দিলো।

রানুকেও ছাড়ল না পাক সেনারা। তাকে গুলি করেছিল ঠিক পেটেই। ছ’মাস ধরে মাতৃগর্ভে পরম যত্নে বেড়ে উঠা ভ্রুণের পৃথিবীর আলো দেখার আগেই অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার আর্তনাদ স্রষ্টার কাছে পৌঁছেছিল নাকি কেউ জানে না। কালের গহ্বরে হারিয়ে গিয়ে তা হয়তো রহস্যাবৃতই থাকবে। পাক সেনারা যাওয়ার আগে খাওয়ার জন্য বাড়ির পোষ্য গাই গোরুটাও নিয়ে চলে গেল।

⏩ আরও পড়ুন: পুতুলনাচের ইতিকথা : বই রিভিউ!

ঘণ্টাখানেক পরে হঠাৎ মজিদের সাথে হাবিবের দেখা হয়। হাবিব একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে কোথায় জানি যাচ্ছিল। হাবিবকে দেখেই বলল, ‘হাবিব মিয়া তাড়াতাড়ি বাড়িত যাও। কিছুক্ষণ আগে তোমাগো বাড়িত মিলিটারি আইছিল!’

হাবিব তার অস্ত্রটা ওই মুক্তিযোদ্ধাকে দিয়ে পাগলের মতো ছুটল বাড়ির দিকে। বাড়িতে গিয়ে দেখল, উঠোনে রক্তের মিছিল। তামাটে মাটি লাল, থকথকে হয়ে আছে।

‘দীপু, ও দীপু, উঠ বাজান!’

‘আব্বা! আব্বা! কথা কন না!’

হাবিবের আহাজারিতে প্রকৃতিতে নীরবতা নেমে আসে যেন। পাখিরাও একদম নিশ্চুপ। শো শো বাতাসে, কেমন জানি রহস্যময়, বিভীষিকাময় অতিপ্রাকৃতিক পরিবেশ। শেষে রানুর দিকে চোখ পড়ে হাবিবের।

রানুর মুখে অরণ্যের মায়া পড়েছে। জোছনা রাতে, নিশ্চুপ গভীর অরণ্যের যে মায়া, সে রকম। রানুকে যেদিন সে বিয়ে করে এনেছিল, লাল টুকটুকে শাড়িতে পরির মতো লাগছিল তাকে। ১২ বছর আগের সেই রানু আর এই মৃত রানুর মধ্যে বেশ মিল। শুধু আজ শাড়িটা রক্তে ভিজে লাল হয়েছে। হাবিব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল রানুর ফর্সা মুখটার দিকে। এদিকে ততক্ষণে শান্তি কমিটির মজিদ পাক সেনাদের নিয়ে আবার এসে হাজির হলো রক্তভেজা উঠোনটায়।

দুই.

বছরের শেষ দিকে, ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। পাক বাহিনী পালালো এদেশ ছেড়ে। শান্তি কমিটিও গা ঢাকা দিলো কয়েক বছরের জন্য। দুই-তিন বছর পর মজিদ, কেরামতরা গ্রামে ফিরে এসে আবার শান্তিতে বসবাস শুরু করল।

এরপর বহু বছর কেটে গেছে। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুই বদলে গেছে। বদলে গেছে শান্তি কমিটি। শান্তি কমিটির ওপর লেগেছে ‘মুক্তি বাহিনী’ লেভেল। শান্তি কমিটির সদস্যরা হয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধা।

মজিদের বড়ো ছেলে এখন সরকারি চাকরি করে। নাতি সরকারি কলেজে চান্স পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। আর হাবিব? হাবিব আর হাবিবের পরিবার সময়ের অতলে হারিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো লিস্টে নেই হাবিবের নাম। তার বাড়িটা এখন কেরামতের দখলে। কিন্তু এদেশের মাটি তো ভুলে না। এ মাটিতে যে মিশে আছে হাজার হাজার পরিবারের আর্তনাদ, লক্ষ লক্ষ শহিদের রক্ত।

গল্প: শান্তি কমিটি

লেখক: আবুল হাসনাত বাঁধন

প্রথম প্রকাশ: ‘বিবর্ণ প্রহর’ (২০১৬) যৌথ গল্প সংকলন এ প্রথম প্রকাশিত।

⏩ আরও পড়ুন: রামগোলাম : হরিজন সম্প্রদায়ের এক অনবদ্য উপাখ্যান!

প্রিয় পাঠক, ‘শান্তি কমিটি’ – গল্পটি ভালো লাগলে পরিচিত বন্ধুদের কাছে শেয়ার করুন। আবুল হাসনাত বাঁধন এর লেখা ‘শান্তি কমিটি’ এর মতন আরও নতুন নতুন গল্প পড়তে চাইলে ডেইলি লাইভে যুক্ত থাকুন।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

1 thought on “শান্তি কমিটি | আবুল হাসনাত বাঁধন”

মন্তব্য করুন:

Scroll to Top